বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

“এক নেতা এক পদ” এই নীতি নিয়ে একটি নির্দিষ্ট অবস্থান ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ -আইয়ুব চৌধুরী সাবেক ছাত্র নেতা

  • প্রকাশিত: 26 August 2026, 4:28 AM | আপডেট: ১ দিন আগে

বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্য্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাজনৈতিক দল হিসেবে বৃহত্তম। বিএনপির দলীয় রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনা উভয় ক্ষেত্রেই “এক নেতা এক পদ” এই নীতি নিয়ে একটি নির্দিষ্ট অবস্থান ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আলোচনা রয়েছে। বিএনপির এই অবস্থানকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায় যথা- দলীয় গঠনতন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনা ও সাংবিধানিক সংস্কার। এই বিষয়ে দলীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থান পরিস্কার করে দলের গঠনতন্ত্রে ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৫ নম্বর ধারায় ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি যুক্ত করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল কোনো ব্যক্তি যেন একই সঙ্গে দলের একাধিক স্তরের (যেমন: একাধারে কেন্দ্রীয় ও জেলা কমিটি) শীর্ষ পদে থাকতে না পারেন। কিন্তু গঠনতন্ত্রে যুক্ত হলেও বিগত ১০ বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বিএনপি এটি পুরোপুরি কার্যকর করতে পারেনি।
বরং অনেক নেতার হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে যায় এমনকি ২০২৬ সালে দল রাস্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সেই নেতাদের পদ পদবীর লোভ আরও বেড়ে গিয়ে কারো কারো ১০/১২ টা পদ পদবী দখলে চলে যায়। উদাহরণ স্বরূপ রাঙ্গামাটির কোন কোন নেতার পদের তালিকা লিখতে গেলে দুই তিন পাতা কাগজের দরকার হবে। তাদের কারো কারো পদ বাকি আছে একটাই সেটা হল, “জাতীয় টাট্টি কমিটি ” তৈরী হলে সেটার পদ পদবী দখল করা।
সত্যিকার অর্থে এই ধরনের পরিস্থিতি প্রায় সারাদেশেই এবং এইজন্য দলের তৃণমূল পর্যায়ে বর্তমানে প্রচন্ড অসন্তোষ বিরাজমান । এই পরিস্থিতি যেকোনো সময় দলের আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিনস্ট করতে পারে। এটার সবচেয়ে বড় কূফল হল যোগ্য নতুন নেতৃত্বের সৃস্টি না হওয়া। এই জন্য এখন বিএনপিকে কঠোর অবস্থান নিয়ে সারাদেশে দলের নেতাদের “এক ব্যক্তি, এক পদ ” নীতি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে। অন্যথায় দলীয় কলহ কোন্দল ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে দলকে সাংগঠনিক ভাবে দূর্বল করে দিবে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক দল ও সরকার পরিচালনায়ও ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি বাস্তবায়নে বিএনপিকে উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ দেশের উন্নয়নের জন্য রাস্ট্র সংস্কার ও গণতান্ত্রিক সংস্কার খুবই প্রয়োজনীয় ধারণা। বিএনপি যেহেতু বর্তমানে রাস্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে সেখানেও “এক ব্যক্তি এক পদ” নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। যার মূল বিষয় হল কোনো ব্যক্তি একই সঙ্গে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে (যেমন: প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী) এবং রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পদে (যেমন: সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক) থাকতে পারবেন না। এই নীতিটি দল এবং সরকারের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি করে সুশাসন নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের মন্ত্রী বা প্রধান হিসেবে একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রের সবার প্রতিনিধি। কিন্তু তিনি দলের প্রধান বা কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের চেয়ে দলীয় স্বার্থ বা ব্যক্তি স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু “এক ব্যক্তি,এক পদ” এই নীতি সেই ঝুঁকি কমায়। এতে রাস্ট্র পরিচালনায় কাজের গতি ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। ফলে দেশ ও জনগণ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন লাভ করে। দল ও সরকার আলাদা থাকলে সরকারি আমলাতন্ত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ পায়। আবার রাষ্ট্র পরিচালনা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ,এতে প্রচুর মেধা, দূরদর্শিতা, সৃজনশীলতা,দক্ষতা প্রয়োজন। কিন্তু, দলীয় কর্মকাণ্ডের সাথে যদি সরকারের প্রধান বা অন্যান্য মন্ত্রীরা যুক্ত থাকে সেইক্ষেত্রে সরকারি কর্মকাণ্ডে পুরো মনোনিবেশ সম্ভব নয়। এর সবচেয়ে বড় খারাপ দিক হল সরকার তখন আমলা, পুলিশ বা অন্যান্য সরকারি সংস্থার উপর নির্ভরশীল হয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়। ক্ষমতার লোভ বেড়ে যায় এবং তখন বাধ্য হয়ে রাতের ভোট বা ভোটারবিহীন নির্বাচন আয়োজন করতে বাধ্য হয়। আর এইসবের পরিণতি হল দুই বছর আগে হাসিনার পলায়ন।
অন্যভাবে বিশ্লেষণ করলে সরকার প্রধান ও দলের প্রধান এক ব্যক্তি হলে সমস্যা হল দলের শীর্ষ নেতা যখন সরকারে ব্যস্ত থাকেন, তখন দলের অন্যান্য স্তরের নেতাদের মূল্যায়ন এবং নতুন নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার পথ তৈরি হয় না। আর দলের প্রধান যদি সার্বক্ষণিকভাবে শুধু দলের পেছনে সময় দেন, তখন তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায় এবং দলের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী হয়। এতে সরকারের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হয়। বরং সরকারের কোনো ভুলের জন্য দলের সাধারণ কর্মীরা তখন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, আর এইক্ষেত্রে দল সরকারের কর্মকাণ্ডের একটি নিরপেক্ষ তদারককারী ও সমালোচক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
যদিও বিশ্বের প্রাচীন গণতন্ত্র গ্রেট ব্রিটেন বা যুক্তরাজ্যে নির্বাচনে জয়ী দলের প্রধানই প্রধানমন্ত্রী হন। তবে দলের দৈনন্দিন সাংগঠনিক কাজের জন্য একটি শক্তিশালী পৃথক কমিটি বা নির্বাহী কাঠামো থাকে এবং সেখানে কোন প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী সরকার পরিচালনায় কুড়ি থেকে বিশ করলেই প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীগণ পদত্যাগ করে নতুন কাউকে নিয়োগ দেয়। আর আমাদের দেশে গলায় দড়ি দিয়ে টানলেও পদত্যাগ করতে চায় না। তাই আমাদের “এক ব্যক্তি এক পদ ” নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতের কিছু প্রধান রাজনৈতিক দল (যেমন: বিজেপি বা কংগ্রেস) সাংগঠনিকভাবে এই নীতি বা এর কাছাকাছি চর্চা বজায় রাখার চেষ্টা করে। যেমন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দলের সভাপতি পদ অন্য সিনিয়র নেতার (যেমন: অমিত শাহ বা জে পি নাড্ডা) নিকট হস্তান্তর করেছিল।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে একই ব্যক্তি দলের প্রধান এবং সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করে এসেছেন (যেমন: আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বা জাতীয় পার্টি শাসনামলে)। তবে দেশের সুশীল সমাজ, সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক দল এবং বর্তমান ২০২৪-২০২৬ এর রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত মান পরিবর্তনের জন্য “এক ব্যক্তি এক পদ” এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য জোরালো দাবি পেশ করে রেখেছে। আর এই নীতি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মঙ্গল, জনগণের মঙ্গল, বিএনপি ও সকল রাজনৈতিক দলের মঙ্গল হবে। লেখক-আইয়ুব চৌধুরী সাবেক ছাত্র নেতা

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...