মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল

  • প্রকাশিত: 4 September 2026, 5:06 PM | আপডেট: ১ মাস আগে

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যা সংক্ষেপে বিএনপি হিসেবে পরিচিত, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অনেক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হলেও বেশিরভাগ দলই রাজনৈতিক উত্থান পতন বা সরকারি নিপীড়ন সহ্য করে ঠিকে থাকতে পারেনি কিন্তু বিএনপি এর ব্যতিক্রম। এটা শুধু টিকেই থাকেনি বরঞ্চ বেশ কয়েকবার রাস্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে এবং এখনো করছে। এই দলের মূল শক্তি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিপুল জনপ্রিয়তা যিনি দেশের দূর্নীতিগ্রস্থ অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ব্যতিক্রমীভাবে অত্যন্ত সৎ, সাধাসিধা, নির্লোভ, একজন মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিক ছিলেন। জেনারেল জিয়ার এই বিপুল জনপ্রিয়তা অদ্যাবধি জনগণকে বিএনপিমুখি করে রেখেছে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত। সারাবিশ্বের প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই ভূল ক্রুটি থাকে এবং বিএনপিও এর ব্যতিক্রম নয়।
কিন্তু মজার বিষয় হল বিএনপি যখনই রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে বা সরকার গঠন করেছে, তার প্রতিটি অধ্যায়ের পেছনেই ছিল কোনো না কোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান বা পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপট। একেবারে শুরুতেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ততকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটি সরকার গঠনের সময়কাল বিশ্লেষণ করলে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

যেমন ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর দু:খজনক হত্যাকাণ্ডের পর দেশে এক চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও ৭ নভেম্বরের পালটা সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই সময়ের সেনাবাহিনীর উপ প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাস্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।

একপর্যায়ে তিনি সেনাপ্রধান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাস্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার এই দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শান্ত হয়। এই সামরিক-রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথম বিএনপি সরকার গঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাসনকাল বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সময় হিসেবে গণ্য করা হয়।তার সময়ে অসংখ্যবার সেনা বিদ্রোহ হয় এবং তিনি শাসক হিসেবে সেইসব কঠোরভাবে দমন করে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।

পরবর্তীতে লে: জে: এইচ এম এরশাদের ৯ বছরের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দেশে একটি ঐতিহাসিক সর্বদলীয় ছাত্র-জনতার আন্দোলন গড়ে উঠলে ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এরপর ১৯৯১ সালে তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ওই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট জিয়া’র স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। যা সেসময় বিপুল রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দেয়। এবং বেগম জিয়া সফলতার সাথে ৫ বছর দেশ পরিচালনা করেন। সেই সময় তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দেশে বিএনপি সরকার ও বিরোধীদল সমূহের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের জন্য ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ দল বর্জন করেছিল। বিএনপি সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে তত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার বিল পাশ করে দিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ নিস্পত্তি করে দেশকে সাংবিধানিক সংকট হতে বাঁচায়। ফলে এই সংসদ অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী হয় এবং সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে বিএনপি পদত্যাগ করে।

পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আরেকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সরকার গঠন করে এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষে দেশে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়। দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং তৎকালীন রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো বিভিন্ন আন্দোলন গড়ে তোলে। ফলশ্রুতিতে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে পুনরায় সরকার গঠন করে।

সর্বশেষে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে কৃষক,শ্রমিক, ছাত্র, জনতার বিপুল ব্যাপক আন্দোলন ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থানে রূপ নিলে আওয়ামী লীগের সরকারের পতন হলে দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে বাঁচেন। এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ২০২৬ সালের নির্বাচনে জনাব তারেক রহমান এর নেতৃত্বে বিএনপি বিপুল বিজয় লাভ করে১৭ বছর পর সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিএনপি কোনো সাধারণ ও শান্ত রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় ক্ষমতার দৃশ্যপটে আসেনি; বরং প্রতিবারই দেশের বড় কোনো সামরিক অভ্যুত্থান, স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদী বিরোধী গণআন্দোলন বা তীব্র রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়েই দলটির সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়েছে। তাহলে বর্তমান বিএনপি সরকারের বুঝা উচিত প্রতিটি পরিবর্তনেই জনগণ বিশ্বাস করে বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দেয় সুন্দরভাবে দেশ পরিচালনার জন্য। আশা করি বিএনপি অতীত অভিজ্ঞতায় সততা, দূরদর্শিতা, নির্মোহভাবে দেশ পরিচালনা করে জনগণকে স্বস্তি এনে দেবে। এখানে বিএনপিকে মনে রাখতে ভুল করার সুযোগ কম,কারণ ইতিহাসের শিক্ষা বড়ই নির্মম,আর জনগণের প্রতিশোধ অতি ভয়ংকর।
বিএনপি সরকারের জন্য শুভকামনা।  লেখক প্রবীন সাবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...