মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এরসমাবর্তন বক্তৃতা, ২৪ মার্চ, ১৯৪৮

  • প্রকাশিত: 16 September 2026, 4:06 AM | আপডেট: ৪ সপ্তাহ আগে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এরসমাবর্তন বক্তৃতা, ২৪ মার্চ, ১৯৪৮।স্পিচেস এ্যাজ গভর্নর জেনারেল অব পাকিস্তান১৯৪৪-১৯৪৮। পৃষ্ঠা- ৮২।তারিখঃ ২৪শে মার্চ, ১৯৪৮।(ঢাকার রেডিও পাকিস্তান কর্তৃক রেকর্ডকৃত)ভদ্র মহোদয় ও মহোদয়াগণ,’আপনাদের উপাচার্য মহাশয় যখন আমাকে এসেঅনুরোধ করলেন সমাবর্তনে একটা বক্তৃতা দেয়ার
জন্য, আমি তাকে স্পষ্ট বলে দিলাম, আমার নানামুখীএত ব্যস্ততা যে সমাবর্তনের জন্য একটা আনুষ্ঠানিকবক্তৃতা প্রস্তুত করা হয়তো সম্ভব হবে না, যা এইবিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহান বিষয়াদি যেমন শিল্প,ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, আইন প্রভৃতির সাথে মান
সম্মত হয়। যাহোক, আমি অবশ্য প্রতিজ্ঞা করেছিলামযে সমাবর্তন উপলক্ষ্যে ছাত্রদের সামনে দুটো কথাবলব এবং এখন যে কথাগুলো বলব তা এই প্রতিজ্ঞাপূরণই বলা যায়।প্রথমেই উপাচার্য মহাশয়কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করব,বিভিন্ন গালভরা বিশেষণে আমাকে বিশেষায়িত করারজন্য। জনাব উপাচার্য, আমি এখন যা করছি কিংবাযতটা করতে সক্ষম হয়েছি, মোটামুটি সবই ছিল
আমার দায়িত্ব পালন।

একজন মুসলমান হিসেবেসততা এবং নিঃস্বার্থতার সাথে দেশের মানুষের সেবাকরাটা দায়িত্ব হিসেবেই বর্তায়।আপনাদেরকে যখন আমি কথাগুলো বলছি, তারাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নয়, বরঞ্চ এমন একজন বন্ধুহিসেবে বলছি যে সার্বক্ষণিক আপনাদের মমতায়বেধে রাখে। অনেকেই আজকে তাদের ডিপ্লোমা এবংডিগ্রি অর্জন করবেন, আমি তাদের সাধুবাদ জানাই।আপনারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিজেদের যোগ্য প্রমাণকরে জয়মাল্য ছিনিয়ে নিয়েছেন। বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত পরিসরে যেখানে আপনার প্রবেশ করতে যাচ্ছেন সেখানেও আপনাদের সফলতা কামনা করি।অনেকেই আপনাদের শিক্ষাজীবনের শেষপ্রান্তে এবংজীবনের চরম চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। আপনারাভাগ্যবান যে একান্ত নিজেদের একটা স্বাধীনসার্বভৌম দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতেপারছেন, যা আপনাদের পূর্বপুরুষরা পারে নি।পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্মের কারণে যে যুগান্তকারীপরিবর্তনসমূহ সূচিত হয়েছে তা আপনাদের এবংপরবর্তী ছাত্রদের বুঝতে পারাটা জরুরী। পরাধীনতারশিকল আমরা ভেঙেছি, এখন আমরা মুক্ত মানুষ ।

আমাদের দেশ আমাদের একান্ত নিজেদের। আমাদেরসরকার আমাদের একান্ত নিজেদের, জনগণের জন্য,জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ এবং রাষ্ট্রের উন্নতির জন্যকাজ করে যাচ্ছে।যাহোক, স্বাধীনতা মানে কিন্তু লাইসেন্স পাওয়া নয়।এর মানে এই নয় যে তোমার যা ইচ্ছা তুমি করবে,রাষ্ট্রের কে কী মনে করল সেসব না ভেবে যেমন ভাললাগে তেমন আচরণ করবে। আপনাদের উপর
অনেক দায়িত্ব, বলতে গেলে অন্যান্য সময়ের চেয়েওবেশী। আমাদেরকে একতাবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতিহিসেবে কাজ করে যেতে হবে। স্বাধীনতা অর্জনেরসময় যে সামরিক শক্তির দরকার ছিল, তারচেয়েএখন বেশী দরকার উন্নয়নমূলক শক্তির। স্বাধীনতা
অর্জনের জন্য সামরিক শক্তির প্রয়োগের চেয়ে কঠিনহচ্ছে তাকে গড়া তোলাটা। জেলে যাওয়া কিংবাস্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা সরকার পরিচালনার চেয়েসহজতর।

বরঞ্চ যেসব বিপদ আমরা কাটিয়ে উঠেছি এবংযেসব কতিপয় ঝামেলা সামনে আসছে সেসবসম্পর্কে আপনাদের দু’কথা বলি। পাকিস্তান জন্মঠেকাতে না পারার অতৃপ্ত বাসনা মেটানোর জন্যশত্রুরা এখন নজর দিয়েছে আমাদেরকে দূর্বল এবংধ্বংস করার পথ খুঁজতে। একারণেই সরকার ক্ষমতায়আসতে না আসতেই পাঞ্জাব এবং দিল্লির ব্যাপকহত্যাকাণ্ড সংঘটিত হল। হাজার হাজার পুরুষ, নারীএবং শিশুকে জবাই করা হয়েছে এবং লাখ লাখমানুষ ঘর ছাড়া হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেইএমন পঞ্চাশ লাখ মানুষ পাঞ্জাবে এসে হাজিরহয়েছে। দেহ এবং মন উভয় ক্ষেত্রেই বিপর্যস্ত এইদূর্ভাগা অভিবাসীদের পরিচর্যা এবং পুনর্বাসন করতে
যেসব সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে, তা যে কোন বৃহৎরাষ্ট্রকেও পথে নামাতে পারে। কিন্তু, পাকিস্তানেরজন্মকে আঁতুড় ঘরেই যারা মেরে দিতে চেয়েছিল।তারা এতে হতাশ হয়েছে। পাকিস্তান সেই বিপর্যয় কেবল কাটিয়েই উঠেনি বরং আরো শক্তিশালী, মার্জিত এবং পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভাবে সজ্জিত।

এর সাথে সারি বেধে আরো কিছু সমস্যা উদ্ভূত হয়েছে, যেমন, ভারত কর্তৃক আমাদের উদ্বৃত্ত এবং সামরিক যন্ত্রপাতির প্রতি প্রতিশোধমূলক আচরণ এবং অতি সম্প্রতি আপনাদের এই প্রদেশের সাথে পুরোপুরি অর্থনৈতিক অবরোধ স্থাপন। আমার কোন সন্দেহ নেই যে, ভারতীয় প্রদেশের সুচিন্তার মানুষগুলো এসব ঘটনাকে সমর্থন করেন না এবং যারা এসব ঘটাচ্ছেন তাদেরও মন মানসিকতার পরিবর্তন হবে, তারপরও, এসব বিষয়ে আপনাদের ধারণা থাকাটা জরুরি। আমাদের অংশের উপর কড়া নজর রাখার উপর তারা জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে সম্প্রতি আপনাদের প্রদেশের উপর আক্রমণের ঘটনা রহস্যময় রূপ নিয়েছে। অতি দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, আমাদের শত্রুদের মধ্যে কিছু মুসলমানও আছে, যারা প্রাদেশিকতাবাদের জোর প্রচারণা চালাচ্ছে যাতে পাকিস্তান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আগের মত ভারতীয় আধিপত্যের সাথে একাত্ম হয়। যারা এই সব ভাবছে তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছে, যদি তা তাদের চেষ্টা থেকে নিরস্ত রাখছে না। প্রতিটা দিন এক গাদা মিথ্যে বানোয়াট ইস্যু তৈরি করা হচ্ছে যাতে দেখানো যায় যে মুসলমানদের মধ্যে সৌহার্দ্য নেই এবং তাদেরকে আইনবিরোধী কাজ কাজে উদ্বুদ্ধ করা যায়। সাম্প্রতিক কালের ভাষা বিষয়ক বিতর্কের কথাই ধরুন, আমি অতীব দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি আপনাদের অনেকেই প্রাদেশিকতাবাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন, যা অতি সূক্ষ্মভাবে এই প্রদেশে বুনে দেয়া হয়েছে, যদিও আপনাদের প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সুস্পষ্ট মত দিয়েছেন। আপনাদের মনে কি এটা কখনও জাগে না যে, যে দেশের পত্রিকাগুলোর কাছে পাকিস্তান কেবল একটি অভিশাপের নাম, তারাই ভাষার ব্যাপারে আপনাদের অধিকার শেখাতে আসছে? এটা কি মনে হয় না যে, অতীতে যে লোকটা মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করেছে কিংবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, হুট করে ভাষার ব্যাপারে সে এখন আপনাদের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভুত হচ্ছে, আপনাদেরকে অধিকার সচেতন হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাচ্ছে? এই ফিফথ কলামনিস্টদের থেকে সাবধান হোন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার ব্যাপারে আমার দৃষ্টিভঙ্গি আরেকবার ব্যাখ্যা করি। এই প্রদেশের অফিসিয়াল ব্যবহারের জন্য এই প্রদেশের লোকজন যেমনটা চায় তেমন এক ভাষা তারা পছন্দ করতে পারে। এই ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই, দেশের লোকজন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে নিজেদের পছন্দমত ভাষা পছন্দ করে নিবে। যাহোক, লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা- অর্থাৎ বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত ভাষা অবশ্যই উর্দু হবে, অন্য কিছু নয়। সুতরাং, রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং অবশ্যই উর্দু, যা এমন একটি ভাষা যা উপমহাদেশের লক্ষ লক্ষ মুসলমানদের নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে উঠেছে, পাকিস্তানের প্রতিটি কোণায় কোণায় যে ভাষা অন্য যে কোন প্রাদেশিক ভাষার চেয়ে লোক ভাল বুঝতে পারে, মুসলমানদের কৃষ্টি এবং সংস্কৃতির সাথে সংগতিপূর্ণ এবং অন্যান্য ইসলামি রাষ্ট্রের ভাষাগুলোর মোটামুটি কাছাকাছি।

ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে উর্দুর বিতাড়ন এমনকি অফিসিয়াল ব্যবহার থেকে উর্দুকে বাদ রাখা বিনা কারণে ঘটেনি। ভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে যারা জল ঘোলা করতে চাইছে ব্যাপারটা তাদের অজানা নয়। এই ঝামেলা সৃষ্টি স্বীকার না করে উপায় নেই, যদিও তারা স্বীকার করবে না কেননা তা তাদের মনোবাসনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের ভাষা বিতর্ক সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি এবং অ-বাঙালি মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার প্ররোচনা প্রদান। অবশ্য ভাষা বিতর্কে আপনাদের প্রধানমন্ত্রী করাচি থেকে ফিরে যে স্পষ্ট বয়ান দিয়েছেন যে বাঙালিরা ইচ্ছে করলে বাংলাকে অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ বানাতে পারে, শুনে তারা তাদের কর্মপরিকল্পনা পরিবর্তন করেছে। এখন তারা চাচ্ছে বাংলাকে পুরো পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বানাতে, এবং একটি মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর দাবিকে তারা অগ্রাহ্য করছে। তারা বলছে, বাংলা এবং উর্দু দুটিকেই রাষ্ট্র ভাষা করতে। এই বিষয়ে ভুল করবেন না আপনারা। রাষ্ট্রের একাত্মতার স্বার্থে কেবল একটাই রাষ্ট্রভাষা থাকতে পারে, এবং আমার মতে তা উর্দু; এই বিষয়ে অনেক আলোচনা করেছি, আমাদের শত্রুদের এবং কিছু সুবিধাবাদি রাজনীতিবিদদের ব্যাপারে তাই আপনাদের সতর্ক করছি। আপনারা যারা জীবনের বিস্তীর্ণ পথে হাঁটতে যাচ্ছেন তারা নিজেদেরকে এসব মানুষ থেকে দূরে রাখবেন। যারা আরো কিছুদিন পড়াশুনা চালিয়ে যাবেন তারা নিজেদেরকে স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদদের বলির পাঠা হতে দিয়েন…

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...