মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী: সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার

  • প্রকাশিত: 25 September 2026, 3:05 AM | আপডেট: ৩ সপ্তাহ আগে

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, “জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দল-মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য। নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়েই উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিতে হবে।”

অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল যেন প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছে যায়, সে লক্ষ্যেই কাজ করা হচ্ছে।”

দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, “নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের পরিকল্পনার অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।”

র্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এসব কার্ড সমন্বিত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “দেশের ইতিহাসে এবারই শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ ও স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’কে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রযুক্তির বৈষম্য দূর করার আহ্বান
বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করলেও প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়।”

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুফল কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহায়তা
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, “এ উত্তরণকে টেকসই করতে নিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।”

আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতাও পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরতার গুরুত্ব স্পষ্ট করেছে।”

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চান
মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।”

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কপ-৩১-এ জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরো জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। নিরাপদে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াই সংকটের একমাত্র সমাধান।”

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

জলবায়ু ন্যায়বিচারে জোর
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কপ-৩১-এ জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরো জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথা জানান তিনি।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

শান্তি ও মানবিক বিশ্বের পক্ষে বাংলাদেশ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সংঘাতের সমাধান হতে হবে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে।”

বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাকে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতিও বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরেন।

নিরাপদ অভিবাসন ও শান্তিরক্ষা
নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন উল্লেখ করে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তরুণরা যাতে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পায়, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারে এবং প্রতিটি শিশু তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়—এমন একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।”

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, “গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ কাজ করছে।”

 

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...