বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

চায়না ইকোনমিক এণ্ড ইন্ডাস্ট্রিয়া জোনের উদ্বোধন

  • প্রকাশিত: 28 July 2026, 3:03 AM | আপডেট: ১ দিন আগে

 

বিশেষ প্রতিবেদক ঃ আনোয়ারা চট্টগ্ৰাম।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) এর উদ্বোধন হয়েছে। সে সাথে উন্মোচিত হয়েছে এই অঞ্চলের অর্থনীতির নতুন এক দিগন্ত। সোমবার (২৭ জুলাই) বেলা ১২টায় নানান আনুষ্ঠানিকতার মধ্যদিয়ে এই ইকোনমিক জোনের উদ্বোধন হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরে সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে তা হলো—প্রথমত বিনিয়োগ, দ্বিতীয়ত বিনিয়োগ এবং তৃতীয়তও বিনিয়োগ। কারণ বিনিয়োগই দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রধান চালিকাশক্তি হবে। আজ চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি বর্তমান সরকারের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানোর অঙ্গীকারেরও একটি প্রমাণ।

তিনি আরও বলেন, আমরা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য অপ্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন কমিয়ে আনছি। বাংলাদেশ এখন সপ্তাহের সাত দিন, দিনে ২৪ ঘণ্টা ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত। বর্তমান সরকারের চিন্তা-ভাবনা এটাই। বিনিয়োগের স্বার্থে যা যা পরিবর্তন প্রয়োজন, তা আমরা সব সময় বিবেচনায় রাখছি।
আমরা আমাদের পুঁজিবাজারকেও সম্পূর্ণ পুনর্গঠন করেছি।

এসময় তিনি চীনা বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হোন। এতে আপনারা এখান থেকেই মূলধন সংগ্রহ করতে পারবেন, একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষও আপনাদের প্রকল্পের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবে।
আমি চাই, চীনের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতা শুধু বিনিয়োগেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও আরও বিস্তৃত হোক। এখানে যে শিল্পকারখানাগুলো গড়ে উঠবে, সেখানে বিপুলসংখ্যক দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হবে। তাই আমি চীনের রাষ্ট্রদূতের প্রতি আহ্বান জানাই, আনোয়ারা বা চট্টগ্রামে একটি দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করুন। এতে শুধু এই শিল্পাঞ্চল নয়, স্থানীয় শিল্প ও বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্যও দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে।

এসময় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আনোয়ারা দেশের অন্যতম একটি মাল্টিমোডাল হাব। এখানে বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, জাতীয় মহাসড়ক-১, কর্ণফুলী টানেল এবং উন্নত সড়ক যোগাযোগের সুবিধা একত্রিত হয়েছে। আজ ঐতিহাসিক কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আনোয়ারার এই উর্বর ভূমিতে আমরা শুধু একটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছি না; বরং বাংলাদেশের শিল্পায়নের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছি।

তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমি দেশি-বিদেশি সকল বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও অংশীজনকে আশ্বস্ত করছি যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই প্রকল্পের জন্য নিরাপদ, স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করবে। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। আমি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্পষ্টভাবে বলতে চাই—বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, এবং আমরা সত্যিকার অর্থেই ব্যবসা করতে প্রস্তুত।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, চট্টগ্রামের এই চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন চীন–বাংলাদেশ সহযোগিতার একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প। ২০১৪ সালে প্রাথমিক আলোচনা শুরু, ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় সংশ্লিষ্ট চুক্তি স্বাক্ষর, ২০২২ সালে সমঝোতা স্মারক সই এবং আজকের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন—সব মিলিয়ে এটি এক দশকেরও বেশি সময়ের যৌথ প্রচেষ্টা ও পারস্পরিক আস্থার প্রতীক। এটি আমাদের দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিক অগ্রগতির উজ্জ্বল সাক্ষ্য।

এরআগে স্বাগত বক্তব্য রাখেন চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) প্রেসিডেন্ট ওয়াং বেনকিয়ান বলেন, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে চীন, ভারত এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মতো বিশ্বের তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক শক্তির সংযোগস্থলে অবস্থান করছে। এদেশের নতুন সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ‘ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ আইন–২০২৬’ প্রণয়ন করেছে, যা বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করে তুলেছে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আমরা আন্তরিকভাবে এই শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছি। এসময় তিনি উপস্থিত চীনা উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম সেরা পর্যায়ে রয়েছে। দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্র এই শিল্পাঞ্চলের জন্য সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করেছে। নতুন সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করছে। এই শিল্পাঞ্চলে থাকবে উন্নত অবকাঠামো, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, আকর্ষণীয় নীতিগত সুবিধা এবং সহজ আর্থিক সেবা।

সর্বশেষ বক্তব্যে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, চীন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। আমাদের কারখানাগুলো যে বিপুল পরিমাণ পণ্য চীন থেকে আমদানি করে, তার বেশিরভাগই প্রস্তুত পণ্য নয়; বরং কাঁচামাল, কাপড়, অ্যাকসেসরিজ, যন্ত্রাংশ ও মেশিনারির উপকরণ। এসব চালান আসতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে এবং পরিবহন ব্যয়ও বহন করতে হয়।
যদি এসব সরবরাহকারী আনোয়ারায় উৎপাদন শুরু করে—যেখানে বন্দর, টানেল এবং বিমানবন্দর সবই হাতের নাগালে—তাহলে সরবরাহের সময় কমবে, উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং বাংলাদেশের প্রতিটি রপ্তানিকারক আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, গত মাসে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীন সফরের সময় চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা হয়। তখন জিজ্ঞাসা করা হয়, প্রকল্পটি চালু হতে কত সময় লাগবে। প্রথমে তারা তিন থেকে পাঁচ বছরের কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী তাদের চ্যালেঞ্জ দেন, ১৮ মাসের মধ্যেই তিনি এই জোনে প্রথম কারখানার উৎপাদন দেখতে চান। জবাবে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানও প্রতিশ্রুতি দেন যে ১৮ মাসের মধ্যেই প্রথম কারখানা উৎপাদনে যাবে। তিনি আনোয়ারা ও চট্টগ্রামের জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান, যেন চীনা বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, আনোয়ারার স্থানীয় সাংসদ সরওয়ার জামাল নিজাম, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) ভাইস চেয়ারম্যান লি চাংগে।

এসময় সংসদ সদস্যদের মধ্যে আবু সুফিয়ান, এরশাদ উল্লাহ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, শাহজাহান চৌধুরী, জহিরুল ইসলাম। চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবুর রহমান শামীমসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকতা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠান শেষে একটি সাব-লিজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, পরে সিইআইজেডের স্লোগান উন্মোচন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের উদ্বোধন, প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।#

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...